অনুঘটক বা ক্যাটালিস্ট । অণুঘটকের প্রকারভেদ ও উদাহরণ । বিভিন্ন প্রকার প্রভাবক ও উদাহরণ

1836 খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী বার্জেলিয়াস লক্ষ্য করেন যে, এমন কিছু বস্তু আছে যেগুলোর উপস্থিতিতে একটি রাসায়নিক বিক্রিয়া ত্বরান্বিত হয় কিন্তু বিক্রিয়ার পর ঐ সকল বস্তু ভর ও ধর্মে অপরিবর্তিত থাকে। তিনি বস্তুগুলির নাম দেন প্রভাবক বা অনুঘটক (Catalyst)।

loading this picture

অনুঘটক বা ক্যাটালিস্ট কাকে বলে ?

যেসব পদার্থের উপস্থিতিতে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার বেগ বৃদ্ধি পায় কিন্তু বিক্রিয়া শেষে উক্ত পদার্থের ভর ও রাসায়নিক সংযুতি অপরিবর্তিত থাকে তাদেরকে প্রভাবক বা অনুঘটক বা ক্যাটালিস্ট বলে। প্রভাবকের উপস্থিতিতে কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার বেগ ত্বরান্বিত হওয়ার ঘটনাকে অনুঘটন বা প্রভাবন বলে।

অনুঘটকের প্রকারভেদ

প্রভাবকের শ্রেণিবিভাগ প্রভাবকের প্রভাবন ক্ষমতার প্রকৃতির উপর ভিত্তি করে প্রভাবককে চারভাগে ভাগ করা যায়: 
  • 1. ধনাত্মক অনুঘটক ।
  • 2. ঋণাত্মক অনুঘটক ।
  • 3. স্ব-প্রভাবক অনুঘটক ।
  • 4. আবিষ্ট অনুঘটক ।
ধনাত্মক অনুঘটক: যে রাসায়নিক পদার্থের উপস্থিতিতে কোন রাসায়নিক বিক্রিয়ার বেগ বৃদ্ধি পায় তাকে পজেটিভ ক্যাটালিস্ট বা ধনাত্মক অনুঘটক বলে।

যেমন : পটাশিয়াম ক্লোরেট কে সাধারনত 630 ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণতায় উত্তপ্ত করলে যেখানে অক্সিজেন উৎপন্ন হয় সেখানে ম্যাঙ্গানিজ ডাই অক্সাইড পটাশিয়াম ক্লোরেট কে উত্তপ্ত করলে মাত্র 200 থেকে 250 ডিগ্রি সেলসিয়াসে অক্সিজেন উৎপন্ন হয়। এক্ষেত্রে ম্যাঙ্গানিজ-ডাই অক্সাইড ধনাত্মক অনুঘটকরূপে কাজ করে।
2KClO3 + [ MnO2 ও তাপ প্রয়োগ ]→ 2KCl+O2 

ঋণাত্মক প্রভাবক বা ঋণাত্মক অনুঘটক : ঋণাত্মক প্রভাবক কোনো রাসায়নিক বিক্রিয়ার স্বাভাবিক গতিকে হ্রাস করে।

যেমন হাইড্রোজেন পার অক্সাইডের বিয়োজনে অল্প পরিমাণ গ্লিসারিন যোগ করলে এর বিয়োজন হ্রাস পায়।
2H2O2 + [ গ্লিসারিন ]→ 2H2O+O2 

অটো প্রভাবক বা স্ব-প্রভাবক: কিছু কিছু রাসায়নিক বিক্রিয়ার ক্ষেত্রে দেখা যায় উৎপন্ন পদার্থের কোনো একটি পদার্থ ঐ বিক্রিয়ার গতিকে বৃদ্ধি করে,

যেমন- অক্সালিক অ্যাসিড দ্রবণে সালফিউরিক এসিড মিশ্রিত KMnO4 দ্রবণ ফোঁটায় ফোঁটায় যোগ করলে প্রথমে KMnO4 এর গোলাপী বর্ণ ধীরে ধীরে বিদূরিত হয়। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই এই বর্ণ দ্রুত দূর হয়। এক্ষেত্রে Mn2+(ম্যাঙ্গানাস) আয়ন অটো প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

5HOOC−COOH+3H2 SO4+2KMnO4→K2 SO4+2MnSO4+10CO2+8H2O

আবিষ্ট প্রভাবক বা আবিষ্ট অনুঘটক: কখনও কখনও একটি বিক্রিয়কের প্রভাবে অপর একটি বিক্রিয়কের ক্রিয়া প্রভাবিত হয়। এ ধরনের প্রভাবক অপর বিক্রিয়কটিকে প্রভাবিত করে।

যেমন-Na3AsO3জারিত হয় না। অথচ Na2SO3 ও Na3AsO3 এর মিশ্রণে O2 চালনা করলে উভয়েই জারিত হয়। এক্ষেত্রে Na2SO3এর প্রভাবে Na3AsO3 জারিত হয় বলে Na2SO3 আবিষ্ট প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।

2Na2 SO3+O2→2Na2 SO4 Na3 AsO3+O2→জারিত হয় না Na2 SO3+Na3 AsO3+O2→Na2 SO4+Na3 AsO4

বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী পদার্থের ভৌত অবস্থা এবং প্রভাবকের ভৌত অবস্থার উপর নির্ভর করে প্রভাবককে দুইভাগে ভাগ করা যায়ঃ
  • 1. সমসত্ত্ব প্রভাবক
  • 2. অসমসত্ত্ব প্রভাবক
  • 3. এছাড়াও এনজাইম প্রভাবক নামে আরও একটি প্রভাবক আছে।
সমসত্ত্ব অনুঘটক : অনুঘটক ও বিক্রিয়কের দশা একই হলে উপস্থিত অনুঘটককে সমসত্ত্ব অনুঘটক বলে। এ সব ক্ষেত্রে অনুঘটক বিক্রিয়ার অংশগ্রহণকারী কোন বিক্রিয়কের সাথে বিক্রিয়া করে একটি মধ্যবর্তী জটিল পদার্থ তৈরি করে। মধ্যবর্তী জটিল পদার্থটি পরে বিযোজিত হয়ে অথবা বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী অপর বিক্রিয়কের সাথে বিক্রিয়া করে উৎপাদ গঠন করে এবং অনুঘটক তার মূল অবস্থায় বিমুক্ত হয়। অনুঘটক সম্পর্কিত এ মতবাদকে অন্তর্বর্তী যৌগ তত্ত্ব বলে।

অসমসত্ত্ব অনুঘটক : যে সমস্ত বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী বস্তু এবং অনুঘটকের ভৌত অবস্থা ভিন্ন থাকে তাদের অসমসত্ত্ব অনুঘটক বলে।
যেমন- অ্যামোনিয়া গ্যাস উৎপাদনে কঠিন আয়রনের ব্যবহার। অসমসত্ত্ব অনুঘটকের উপস্থিতিতে সাধারণত গ্যাস বা তরল পদার্থ কঠিন অনুঘটকের পৃষ্ঠতলে বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। এজন্য অসমসত্ত্ব অনুঘটককে কখনো কখনো সংযোগ বা স্পর্শ অনুঘটক বলে।

 অসমসত্ত্ব অনুঘটকের উপস্থিতিতে একটি বিক্রিয়া নিম্নলিখিত ৪টি ধাপে অংশগ্রহণ করে।
  • ১. অনুঘটকের পৃষ্ঠতলে বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী একটি বিক্রিয়কের অণুসমূহ রাসায়নিকভাবে অধিশোষিত হয়
  • ২. এত অণুর অধিশোষিত প্রান্তের সাথে অনুঘটক পৃষ্ঠতলের এক ধরনের বন্ধন সৃষ্টি হয় এবং অণুটির অধিশোষিত প্রান্তের সাথে অপর প্রান্তের বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ে
  • ৩. ফলে অপর বিক্রিয়কের অণু এ দুর্বল বন্ধনে আঘাত করে বন্ধনটিকে ভেঙ্গে ফেলে; এতে বিক্রিয়া ত্বরান্বিত হয়
  • ৪. সবশেষে বিক্রিয়ায় উৎপন্ন পদার্থ অনুঘটকের পৃষ্ঠতল থেকে বিমুক্ত হয়।

গ্যাসীয় বিক্রিয়কের ক্ষেত্রে : 
V2O5 বা Pt চূর্ণের উপস্থিতিতে SO2 এর জারণ প্রক্রিয়ায় SO3 উৎপাদন। এক্ষেত্রে বিক্রিয়কগুলি গ্যাসীয় দশায় এবং প্রভাবক কঠিন দশায় উপস্থিত থাকে।

2SO2+O2+[Pt/V2O5] →2SO3+[ Pt/V2O5 ]

গ্যাস + গ্যাস +কঠিন → গ্যাস + গ্যাস
তরল বিক্রিয়কের ক্ষেত্রে:
Pt চূর্ণের উপস্থিতিতে H2O2এর জলীয় দ্রবণের বিয়োজন। এক্ষেত্রে বিক্রিয়ক তরল দশায় এবং প্রভাবক কঠিন দশায় উপস্থিত থাকে।

2H2O2 + [Pt] → 2H2O + O2
তরল + কঠিন → তরল + তরল

এনজাইম প্রভাবক: এনজাইম হলো ঈস্ট থেকে নিঃসৃত প্রাণহীন অদানাদার নাইট্রোজেনযুক্ত জটিল কাঠামোর বৃহদাকার প্রোটিন জাতীয় জৈব পদার্থ। অন্যকথায়, এনজাইম হচ্ছে জীবন্ত কোষ থেকে সৃষ্ট উচ্চ আণবিক ভর বিশিষ্ট অদানাদার নাইট্রোজেনপূর্ণ রহস্যময় জৈব যৌগ। এনজাইমের প্রভাবে যে প্রভাবন ক্রিয়া সংঘঠিত হয় তাকে এনজাইম প্রভাবন বলা হয়। এ পর্যন্ত প্রায় 3000 এনজাইম সনাক্ত করা গেছে।

প্রভাবকের কার্যকারিতার উপর ভিত্তি করে প্রভাবককে আবার দুইভাগে ভাগ করা যায়ঃ

  • 1.প্রভাবক সহায়ক (Catalyst Promoter)
  • 2. প্রভাবক বিষ (Catalyst Poison)
সমসত্ত্ব ও অসমসত্ত্ব উভয় ক্ষেত্রে বিক্রিয়াটি নির্দিষ্ট পথে না হয়ে অনুঘটকের উপস্থিতিতে একটি বিকল্প পথে সংঘটিত হয়। বিকল্প পথের সক্রিয়ন শক্তি কম থাকে। তাই তুলনামূলকভাবে বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী অধিক সংখ্যক কণা সক্রিয়ন শক্তিকে অতিক্রম করতে পারে বলে বিক্রিয়াটি দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হয়।


অনুঘটক সহায়ক বা বিবর্ধক বা ক্রিয়া বিবর্ধক (Promoters) :
যে সব পদার্থ অনুঘটক বা প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারে না কিন্তু কোন রাসায়নিক বিক্রিয়ায় অনুঘটকের সাথে উপস্থিত থেকে অনুঘটকের অনুঘটন (প্রভাবক) ক্ষমতা বৃদ্ধি করে তাদেরকে অনুঘটন সহায়ক বলে।

যেমন- হেবার প্রণালীতে অ্যামোনিয়া উৎপাদনের সময় আয়রন অনুঘটকের সাথে বিবর্ধক হিসেবে মলিবডেনাম (Mo) বা অ্যালুমিনিয়াম অক্সাইড উপস্থিত থাকে। অনুঘটকের পৃষ্ঠতলের উপর বিক্রিয়ক অণুর অধিশোষিত প্রক্রিয়াকে বিবর্ধক ত্বরান্বিত করে। অনুঘটক পৃষ্ঠতলের অধিশোষণের মাধ্যমে দুর্বল ভ্যান ডার ওয়াল বন্ধন গঠনের জন্য বিক্রিয়ক অণুকে সুবিধাজনকভাবে বিন্যস্ত হতে বিবর্ধক সহায়তা করে। এভাবে বিবর্ধক বিক্রিয়ার হারকে ত্বরান্বিত করে।

প্রভাবক বিষ: যে সমস্ত পদার্থ প্রভাবকের প্রভাবন ক্ষমতা ধ্বংস করে দেয় তাদের প্রভাবক বিষ বলা হয়।

উদাহরণঃ SO2 হতে SO3 প্রস্তুতির সময় Pt প্রভাবক হিসেবে কাজ করে কিন্তু Pt এর সাথে সামান্য পরিমাণ As2O3 থাকলে তা Pt এর প্রভাবন ক্ষমতা ধ্বংস করে দেয়। এক্ষেত্রে As2O3 প্রভাবক বিষরুপে ক্রিয়া করে।

শিল্পপ্রস্তুতিতে বিচুর্ন অনুঘটক ব্যাবহার করা হয় কেন ? 

কারণ গুড়াে করলে অনুঘটক এর ক্ষেত্রফল বাড়ে। কঠিনের উপরিতলে যত বেশি সংখাক অণু, পরমাণু বা আয়ন বিক্রিয়ার সুযোগ পায় বিক্রিয়া ঘটে তত তাড়াতাড়ি। অনুঘটকের কাজও ঘটে তাড়াতাড়ি। তাই রাসায়নিক কারখানায় কঠিন অনুঘটক ব্যবহার করলে তা সুক্ষ্ম গুঁড়াে বা সরু তারজলি আকারে রাখা হয়।