জৈবনিক প্রক্রিয়া । সালোকসংশ্লেষ। ফটোসিন্থেসিস।


জৈবনিক প্রক্রিয়া


সালোকসংশ্লেষ। ফটোসিন্থেসিস।

1893 খ্রিস্টাব্দে বিজ্ঞানী চার্লস বার্নেস ফটোসিন্থেসিস শব্দটি সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন। এই শব্দটি গ্রিক শব্দ ফটোজ যার অর্থ হলো আলো এবং সিন্থেসিস অর্থাৎ সংশ্লেষ এর সমন্বয়ে গঠিত। আলোর উপস্থিতিতে খাদ্য সংশ্লেষ হওয়াকে সালোকসংশ্লেষ বা ফটোসিন্থেসিস বলে।


সালোকসংশ্লেষ


সালোকসংশ্লেষ একটি জৈবিক পদ্ধতি যেখানে আলোক শক্তি রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়।সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন খাদ্যের মধ্যে অর্থাৎ শর্করা অণুর মধ্যে রাসায়নিক শক্তি স্থৈতিক শক্তিরূপে আবদ্ধ হয়।
সবুজ উদ্ভিদ পরিবেশ থেকে জল এবং কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে সূর্যালোকের উপস্থিতিতে এবং ক্লোরোফিল এর সাহায্যে শর্করা জাতীয় খাদ্য উৎপন্ন করে। সবুজ উদ্ভিদের সূর্যালোকের উপস্থিতিতে খাদ্য সংশ্লেষ সালোকসংশ্লেষ বলে।

  • সালোকসংশ্লেষ এর সংজ্ঞা :

যে শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় ক্লোরোফিল যুক্ত কোষে সূর্যালোকের উপস্থিতিতে এবং ক্লোরোফিলের সহায়তায় পরিবেশ থেকে শোষিত জল ও কার্বন ডাই অক্সাইড এর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় সরল শর্করা সংশ্লেষিত হয় এবং উৎপন্ন খাদ্যের মধ্যে স্থিতি শক্তির আবদ্ধকারণ ঘটে এবং উপজাতি জল ( H২O ) ও অক্সিজেন উৎপন্ন হয়, তাকে সালোকসংশ্লেষ বা ফটোসিন্থেসিস বলা হয় ।


সালোকসংশ্লেষের স্থান:
ক্লোরোফিল যুক্ত উদ্ভিদ দেহাংশ যেমন সবুজ পাতা, ফুলের বৃতি, সবুজ পাপড়ি, সবুজ কান্ড (ফণীমনসা, লাউ, কুমড়ো, পুই) সবুজ মূল (গুলঞ্চ) সবুজ শৈবাল ( স্পাইরোগাইরা ,কারা) মস , ফার্ন ইত্যাদি।

ইউগ্লিনা ক্রাইসমিবা নামক এককোষী প্রাণী , ব্যাকটেরিয়া যেমন রোডো সিউডোমোনাস, রোডোস্পাইরিলাম ইত্যাদিতেও ক্লোরোফিল থাকায় সালোকসংশ্লেষ সম্পন্ন হয়। তবে পাতার মেসোফিল কলা সালোকসংশ্লেষের প্রধান স্থান।
ক্লোরোপ্লাস্ট হলো সালোকসংশ্লেষ কারী অঙ্গানু।

সালোকসংশ্লেষের উপাদান:

প্রধান উপাদান : জল কার্বন ডাই অক্সাইড রঞ্জক পদার্থ হিসেবে ক্লোরোফিল ও ক্যারোটিনয়েড এবং সূর্যালোক।
সহায়ক উপাদান: অ্যাডিনোসিন ডাই ফসফেট( ADP ), নিকোটিনামাইড এডিনোসিন নিউক্লিওটাইড ফসফেট (NADP+)

সালোকসংশ্লেষের উপাদান গুলির ভূমিকা

  • কার্বন ডাই অক্সাইড:

উৎস: স্থলজ উদ্ভিদ পরিবেশ থেকে পত্ররন্ধ্র দিয়ে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় কার্বন-ডাই-অক্সাইড গ্যাস শোষণ করে কার্বন ডাই অক্সাইড পাতার তল দিয়ে ব্যাপন প্রক্রিয়ায় শোষণ করে।

ভূমিকা:

  1. কার্বন ডাই অক্সাইড সালোকসংশ্লেষের একটি প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
  2. সালোকসংশ্লেষে উৎপন্ন গ্লুকোজ এর কার্বন ও অক্সিজেন এর উৎস হলো কার্বন ডাই অক্সাইড। সুতরাং কার্বন-ডাই-অক্সাইড ছাড়া সালোকসংশ্লেষ সম্ভব নয়।

  • সালোকসংশ্লেষে জলের ভূমিকা:

উৎস: জল সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার একটি অন্যতম কাঁচামাল।


https://www.abvrp.com/2019/06/photosynthesis.html


  1. সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার সময় চল বিশিষ্ট হয়ে H+ এবং OH- আয়ন উৎপন্ন করে।OH- আয়নের ইলেকট্রন ক্লোরোফিল অনু কে প্রদান করে।
  2. সালোকসংশ্লেষের অন্ধকার দশা কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে বিজারিত করার জন্য প্রয়োজনীয় হাইড্রোজেন জল বিশ্লিষ্ট হয়েই উৎপন্ন হয়।
  3.  সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় উপজাত পদার্থ রূপের যে অক্সিজেন উৎপন্ন হয় তার উৎস হলো জল।

  • সূর্যালোকের ভূমিকা:

সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় আলো একটি অপরিহার্য উপাদান। আলোর প্রধান উৎস সূর্যালোক ।সূর্যালোকের শক্তির উৎস উচ্চশক্তিসম্পন্ন অদৃশ্য ফোটন কণা যা সালোকসংশ্লেষের সময় ক্লোরোফিল কে বিজারিত ও তেজময় করে তুলতে সক্ষম হয়।

ভূমিকা :

  1. ক্লোরোফিল কণাকে সক্রিয় করা এবং সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি প্রদান করা।
  2. সৌরশক্তি রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে ATP ( অ্যাডিনোসিন ট্রাই ফসফেট) অণুর মধ্যে আবদ্ধ হয়। 
  3. রাসায়নিক শক্তি সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় শক্তির জোগান দেয় এবং শর্করা জাতীয় খাদ্যের মধ্যে স্থৈতিক শক্তিরূপে বর্তমান থাকে।
  4. সৌরশক্তি কোষের ভিতরের ADP ( অ্যাডিনোসিন ডাই ফসফেট) থেকে ATP (এডিনোসিন ট্রাই ফসফেট এ রূপান্তরিত হওয়াকে ফটোসিনথেটিক ফসফোরাইলেশন বলে। 

সালোকসংশ্লেষ ও রঞ্জক পদার্থ:

ক্লোরোফিল: ক্লোরোপ্লাস্ট এর গান আতে ক্লোরোফিল অবস্থান করে । ক্লোরোফিল পাঁচ প্রকারের হয় a ,b, c, d, e । ক্লোরোফিল a এর উপস্থিতিতে ক্লোরোফিল b সালোকসংশ্লেষ ও অংশগ্রহণ।



ভূমিকা: ক্লোরোফিল সূর্যালোকের অদৃশ্য ফোটন কণা বা কোয়ান্টাম শোষণ করে সক্রিয় হয় ও শোষিত জল কে বিশ্লিষ্ট করে বা জলের ফটোসিন্থেসিস ঘটায়।

ক্যারোটিনয়েড: এটি ক্যারোটিন ও জানতো ফিল রঞ্জক নিয়ে গঠিত। ক্যারোটিন ও জ্যান্তফিল আলো শোষণ করে উত্তেজিত হয় কিন্তু প্রত্যক্ষভাবে সালোকসংশ্লেষ করতে পারে না । এই উত্তেজিত রঞ্জক সৌরশক্তিকে ক্লোরোফিল a অনুর স্থানান্তর করে পরোক্ষভাবে সালোকসংশ্লেষের হার বৃদ্ধি করে।
সালোকসংশ্লেষের শোষণ বর্ণালী ও কার্যপ্রণালী: সূর্যালোকের দৃশ্যমান অংশকে প্রিজমের ভিতর দিয়ে প্রতিসরিত করলে যে সাতটি রং এর আলো পাওয়া যায় তার মধ্যে সব বর্ণের আলোর সমানভাবে ক্লোরোফিল দ্বারা শোষিত হতে পারে না। ক্লোরোফিল a এবং -b বর্ণালীর নীল বেগুনী এবং লাল অংশই অধিক শোষণ করে। যে রেখাচিত্রের মাধ্যমে কোন তরঙ্গ দৈর্ঘ্য যুক্ত আলোর সালোকসংশ্লেষের হার সর্বাধিক তা প্রকাশ করা হয় তাকে সালোকসংশ্লেষের কার্য বর্ণালী বলে।ক্লোরোফিল শোষণ বর্ণালী এর বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘ্য যুক্ত আলো পৃথক ভাবে ব্যবহার করে দেখা গেছে যে ক্লোরোফিল শোষণ বর্ণালীর লাল এবং নীল অংশই সালোকসংশ্লেষের আলোক বিক্রিয়া ঘটে তাই বর্ণালীর নীল ও লাল অংশকে সালোকসংশ্লেষের কার্য বর্ণালী বলে।

সালোক সংশ্লেষ পদ্ধতি:


সালোকসংশ্লেষ একটি শারীর বৃত্তীয় জটিল প্রক্রিয়া। সালোকসংশ্লেষের সময় বায়ুমণ্ডলের কার্বনডাই-অক্সাইড পত্ররন্ধ্রের মাধ্যমে পাতায় প্রবেশ করার পর সূর্যালোকের উপস্থিতিতে ক্লোরোফিলের সহায়তায় জল এবং কার্বন ডাই অক্সাইড এর রাসায়নিক বিক্রিয়ায় শর্করা জাতীয় পদার্থ সৃষ্টি হয়। আসলে সালোকসংশ্লেষ একটি জারণ বিজারণ, যেখানে জল জারিত হয়ে অক্সিজেন মুক্ত করে এবং কার্বন ডাই অক্সাইড বিজারিত হয়ে শর্করা প্রস্তুত করে। সালোকসংশ্লেষের সামগ্রিক রাসায়নিক বিক্রিয়া টি নিম্নরূপ

হাজার 905 খ্রিস্টাব্দের বিজ্ঞানী ব্ল্যাক ম্যান প্রথম প্রমাণ করেন সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়া টি দুটি পৃথক পর্যায়ে সম্পন্ন হয়। যথা আলোক নির্ভর দশা ও অন্ধকার দশা।

Post a Comment

0 Comments