সাবান-জলে হাত ধোয়া ৩০০ কোটির কাছে বিলাসিতা

প্রেরক - দীপক সাহা , শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক , করিমপুর  নদিয়া ।

টুটুল, ট্যাপের জলে ভালো করে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে নাও।
- মা, সকাল থেকে পাঁচ বার ধুলাম। হাত সাদা হয়ে গেছে। আর পারছি না।
- না বাবু, এরকম বলতে নেই। দেখছ না, টিভিতে বারে বারে হাত ধুতে বলছে।
- আচ্ছা মা, রফিকদের কী হবে? ওরা তো বস্তিতে থাকে। ওর মা সকাল হলেই রাস্তার টাইমকলে লম্বা লাইনের পেছনে কলসী নিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকে। আমি যখন মর্নিং-এ স্কুলে যেতাম তখনও দেখতাম দাঁড়িয়ে। আবার স্কুল থেকে ফেরার সময়ও দেখতাম একই জায়গায় দাঁড়িয়ে।   
  
Image loading

        
রান্নাঘরে টুটুলের মা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। রফিকের মা টুটুলদের বাড়ির কাজের দিদি। রফিকের বাবা, পরিযায়ী শ্রমিক সুরাটে কাজ করতে গিয়ে আটকে পড়েছেন।           

 বিশ্বত্রাস করোনা মোকাবিলায় অন্যতম অস্ত্র সাবান ও জল। সে কথাই জোর দিয়ে বলছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)।টিভি, খবরের কাগজ, মোবাইল কলার টিউন, স্যোসাল মিডিয়া মানুষকে ঘনঘন এ-ব্যাপারে সচেতন করছে। প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী, চিকিৎসকরাও পাখি পড়ানোর মতো শিখিয়ে দিচ্ছেন বারে বারে সাবান-জল দিয়ে হাত ধোওয়ায় প্রয়োজনীয়তা। রূপালি পর্দার জনপ্রিয় সেলিব্রেটিরা টিভির পর্দায় নামি-দামি ব্র্যান্ডের ট্যাপকল খুলে হাতেকলমে দেখিয়ে দিচ্ছেন কীভাবে ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান-জলে হাত পরিষ্কার করতে হয়। লক ডাউনে এইসব শুনতে শুনতে দেখতে দেখতে চোখকান বোদা হয়ে গেল। কিন্তু ব্যাপারটা এখানে শেষ নয়। জল আর সাবানের যুগলবন্দীর গল্পে একটা বড়সড় ফাঁক রয়েছে। সম্প্রতি ইউনিসেফ এক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে, তা শুধু অবিশ্বাস্য নয়, উদ্বেগেরও। ওই রিপোর্ট বলছে, বিশ্বের প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে দু'জনের হাত ধোয়ার কোন ব্যবস্থাই নেই! অর্থাৎ বিশ্বের মোট জনসংখ্যার চল্লিশ শতাংশ বা তিনশো কোটি মানুষের কাছে সাবান ও জল দিয়ে হাত ধোয়া রীতিমতো 'বিলাসিতা'!   
স্যোসাল ডিসট্যানসিং কী, খায় না মাথায় রাখে এঁরা  জানেন না।
পৃথিবীতে এমন দেশও আছে যেখানে এক ফোঁটা জলের জন্য অগণিত মানুষ সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত চাতক পাখির মতো হাপিত্যেশ করে। এমন দেশও রয়েছে যেখানে তেলের চেয়ে জলের মূল্য বেশি। জল-দুর্লভ আরব বিশ্বের প্রায় সাড়ে সাত কোটি মানুষ পর্যাপ্ত জলের অভাবে প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। শুধু সুদানেই ৩ কোটি ১০ লাখ মানুষ ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া যুদ্ধবিধ্বস্ত ইয়েমেনে ১ কোটি ৪০ লাখ ও মিশরের প্রায় এক কোটি মানুষ জল, স্যানিটাইজার সংকটে ভুগছে। জাতিসংঘের হিসাবে, আরব বিশ্বের অন্তত ৮ কোটি ৭০ লাখ মানুষের বাড়িতেই বিশুদ্ধ জলের সরবরাহ নেই। ভারতের ৬০ কোটিসহ বিশ্বের ২৩০ কোটি মানুষের শৌচাগার নেই। এখনও বনে-বাদাড়ে, নর্দমায়, ট্রেন লাইন কিংবা রাস্তার পাশে, মজে যাওয়া নদী বা খালের ধারে খোলা আকাশের নীচে শৌচকর্ম করতে হয়। স্বভাবতই তাঁদের মধ্যে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে।
শুধু টিভির পর্দায় সাবান-জলের বিজ্ঞাপন দিলেই করোনা পালাবে না। 
চলুন লক ডাউনে দেশের বাস্তব চিত্রটা দেখি। ১৩০ কোটি জনসমৃদ্ধ দেশের মোট ৬ লক্ষ ৫৬ হাজার গ্রাম রয়েছে৷ সেখানে ১৯ কোটি ১৯ লক্ষ পরিবার বসবাস করে৷ খবরে প্রকাশ, ৮৭ কোটি মানুষ একঘরে পরিবার নিয়ে গাদাগাদি করে বাস করে। চরম দারিদ্র্য নিত্যসঙ্গী চল্লিশ লক্ষ পথবাসী ও সাত কোটি ঝুপড়িবাসীর। তাঁরা অতি অস্বাস্থ্যকর ঘিনঘিনে দুর্গন্ধময় গণশৌচাগার ব্যবহার করেন। রাস্তার বারোয়ারী ট্যাপকলে বালতি, গামলার লম্বা লাইন। পরিস্রুত জল এঁদের কাছে আকাশের চাঁদ। সাবান-জলে বারে বারে হাত ধোয়া তাঁদের কাছে আকাশকুসুম কল্পনা। স্যোসাল ডিসট্যানসিং কী, খায় না মাথায় রাখে এঁরা  জানেন না। তাই মুম্বাইয়ে এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম বস্তি ধারাভি করোনা ভাইরাসের মুক্তাঞ্চল। করোনা মোকাবিলায় চূড়ান্ত দারিদ্র্যতা ভারতকে নিঃসন্দেহে কঠিন চ্যালেঞ্জের সামনে দাঁড় করিয়েছে।

Image loading crowd


গেল বছর নীতি আয়োগ দেশের ২৪ রাজ্যের তথ্য বিশ্লেষণ করে এক উদ্বেগজনক রিপোর্ট পেশ করেছে। নীতি আয়োগের সমীক্ষায় দেখা গেছে দেশের ৬০ কোটি মানুষের জন্য পরিস্রুত  পানীয় জলের কোনো বন্দোবস্ত নেই৷ দেশে মাত্র ১৮ শতাংশ মানুষ পাইপলাইনে পানীয় জলের পরিষেবা পাচ্ছেন৷ মহারাষ্ট্র, তামিলনাড়ু, তেলেঙ্গানা, কেরল, রাজস্থান ও গুজরাটসহ বিভিন্ন রাজ্যে পানীয় জলের গভীর সঙ্কট । দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আর্সেনিক ও ফ্লুরাইডের উপস্থিতি মারাত্মকভাবে দেখা যাচ্ছে৷ মাইলের পর মাইল হেঁটে দূরদূরান্ত থেকে অতি কষ্টে জল সংগ্রহ করতে হয়। একটি অদ্ভুত তথ্য এ প্রসঙ্গে জানাই। রাজস্থানের কিছু এলাকায় বিবাহযোগ্য পুরুষদের দুটি বিয়ে করা রীতি । প্রশ্ন -কেন? উত্তর - এক বউ বাড়ির কাজকর্ম করেন, অন্য বউ দূর এলাকা থেকে সারাদিনের পথ অতিক্রম করে জল আনেন। মহারাষ্ট্রের ঔরাঙ্গাবাদে ট্রেনে চেপে অনেক দূরে পানীয় জল কিনতে যেতে হয় মানুষকে৷এই গ্রীষ্মেই (এপ্রিল,মে,জুন) চলমান অতিমারিতে জলের সঙ্কট তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফলে করোনার এই ক্রান্তিকালে কঠিন পরিস্থিতিতে জলাভাবে নাজেহাল কোটি কোটি মানুষ।

আরো পড়ুন | করোনাত্রাসিত ভারতে অসহায় প্রবীণরা । বিশ্বত্রাস করোনার কাছে দর্পিত মানুষ ।

 আমাদের রাজ্যের চিত্রটিও আশাপ্রদ নয়। বাঁকুড়া , বীরভূম, পুরুলিয়া বা পাহাড়ের অধিবাসীরা জন্মলগ্ন থেকেই জলকষ্ট দেখেই বড়ো হচ্ছেন। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গের ১২টি জেলার ৬৮ টি ব্লকের ২ কোটি মানুষ আর্সেনিক কবলিত এলাকায় বসবাস করেন৷ সাঁড়াশি আক্রমণ। একদিকে বিষযুক্ত আর্সেনিক জলপান, অন্যদিকে জলের অভাবে করোনার বাড়বাড়ন্ত।

বিজ্ঞানীরা বলেছেন পৃথিবীর মোট জলের শতকরা সাড়ে সাতানব্বই ভাগ (৯৭.৫%) জল লবনাক্ত আর শতকরা আড়াই ভাগ (২.৫%) জল ব্যবহার যোগ্য। তার মধ্যে আবার সাড়ে চুয়াত্তর ভাগ (৭৪.৫%) জল বরফে ঢাকা ও তুষার শৃঙ্গে আটকে আছে। আর মাত্র শতকরা শূন্য তিন ভাগ (০.৩%) জল পাওয়া যায় নদীতে, জলাশয়, পুকুরে, বাঁধে বা ঝিলে এবং শতকরা মাত্র এক ভাগ (১%) জল মাটির নীচে আটকে আছে। এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট জল অপচয় রোধ ও জল সংরক্ষণ কতটা জরুরি।       

 সভ্যতার অগ্রগতি যেমন হচ্ছে, সেইসঙ্গে সেই ভোগবাদী সভ্যতার উপসর্গগুলির নানা পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে। আধুনিক সভ্যতার পৃষ্ঠপোষকতায় ভৌমজলের চূড়ান্ত অপব্যবহার দিনের দিন বেড়েই চলেছে। অন্যদিকে বিজ্ঞানের অপপ্রয়োগে বিশ্ব উষ্ণায়ন, দূষণ লাগামছাড়া। জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বার বার এ ব্যাপারে সতর্কবার্তা দিয়ে আসছেন। নিকট ভবিষ্যতে পৃথিবীজুড়ে জলসংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানী এবং পরিবেশবিদরা। করোনাতাঙ্কে গোটা পৃথিবীজুড়ে জলের তীব্র হাহাকার শুরু হতে আর সময়ের অপেক্ষা। অস্তিত্ব সঙ্কটের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে মানবসভ্যতা। 

আরো পড়ুন | চাঁদনি রাতে লাভা লোলেগাঁও রিসপ ! এ রোমান্টিক অভিজ্ঞতা ভোলার নয়..

আমরা আশাবাদী অচিরেই বিজ্ঞানীরা করোনা ভ্যাকসিন আবিষ্কার করে  মানবজাতিকে আপাতত বিপদমুক্ত করবে । কিন্তু সার্বিক স্তরে সচেতনতার পাশাপাশি উপযুক্ত পদক্ষেপ না নিলে জলাভাবে একদিন হয়তো আমাদের এই সাধের পৃথিবী চিরতরে হারিয়ে যাবে। শেষের সে দিন আসতে বোধহয় খুব বেশি দেরি নেই। দীর্ঘদিন আগে এডমন্ড হিলারী বলেছিলেন, পরিবেশজনিত সমস্যা আসলে একটি সামাজিক সমস্যা, এ সমস্যা সৃষ্টির কারণ ও শিকার দুই-ই মানুষ। আর মানুষই পারে এ সমস্যা সমাধান করতে।