মাতৃদিবস উপলক্ষ্যে বিশেষ ছোট গল্প | প্রতিদিন ই মাতৃদিবস

প্রেরক - দীপক সাহা , শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক , করিমপুর  নদিয়া

পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি আমার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা |  বিশেষ দিনে আমার প্রচেষ্টা : মাতৃ দিবস উপলক্ষে বিশেষ ছোট গল্প সকল মায়েদের উৎসর্গ করলাম।


ইমেজ ক্রেডিট : T-Series
সকাল আটটা। অলস সকালে সোফায় বসে রবীন্দ্র সংগীত শুনতে শুনতে বিপুলের কাছে থেকে চায়ের কাপ নিয়ে অদিতি কেবল কাপের কিনারায় আলতো করে ঠোঁট জোড়া ফাঁক করে ঠেকিয়েছে, ওমনি কলিং বেলের আওয়াজটা শান্ত মনে একটা বিশ্রী দোল খেলে গেল। 

- দিল তো সকালটা মাটি করে। একটু আমেজ করে চা খাব তাতেও বাগড়া।

বিপুল বিস্কুটের অগ্রভাগ চায়ে চুবিয়ে মুখে দিয়ে বললো,

- অত ব্যস্ত হচ্ছো কেন, দাঁড়াও আমি দেখছি।     

শিলিগুড়িতে অরিফ্লেমের বিউটিশিয়ান কোর্স্ক করতে গিয়ে বিপুল আর অদিতির পরিচয়। পরিচয় ছাদনতলায় যেতে লাগে মাত্র ছয় মাস। দশ বছর হল বিয়ে হয়েছে। অদিতির বাপের বাড়ি জলপাইগুড়ি, বিপুলের আলিপুরদুয়ার। বিয়ের পর দুজনেরই বাপের বাড়ি ভোকাট্টা। ওদের আট বছরের এক ফুটফুটে মেয়ে, বর্ণমালা। স্টেশনের ওপারে বিবেকানন্দ একাডেমিতে ক্লাস থ্রিতে পড়ে। প্রাইভেট স্কুল।

আলিপুরদুয়ারে দুর্গাপাড়ায় বিপুলরা দুটো বেডরুমসহ এক ভাড়া বাড়িতে থাকে। মেয়ে, স্বামী, স্ত্রী। ছিমছাম পরিবার। এমনি করেই  দিনগুলো পেরিয়ে যায়। বিপুলের পাত্র মার্কেটে জেন্টস পার্লার। তিনজন কর্মচারী। লকডাউনে সব পার্লার নিলডাউন প্রায় দেড় মাস। অদিতিও বিউটিশিয়ানের কাজ করে। এলাকায় বেশ নামডাক আছে বিউটিশিয়ান হিসাবে। বৈশাখ মাসে অনেক বিয়ের পার্টি ধরা ছিল। করোনা ঝড় সব তছনছ করে দিল।     

বিপুল বাইরে ব্যালকনিতে বেরিয়েই,

- আরে ঝন্টু, কী ব্যাপার এতো সকালে।

- হ্যাঁ দাদা, একটু বিপদে পড়ে এসেছি। বউদি আছেন?

বিপুল ঘরের দিলে মুখ বাড়িয়ে বলে ,

- শুনছো, ঝন্টু এসেছে।

-ঝন্টু, কেন! মেয়ের স্কুল থেকে কোন খবর আছে নাকি?, অদিতি অস্ফুটে বলে ওঠে।

ঝন্টু বর্ণমালার স্কুলের গাড়ির ড্রাইভার। চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে কাপটা টেবিলে রেখে অদিতি বাইরে বেরিয়ে আসে। পেছন পেছন বর্ণমালা কখন এসে বাবার পাশে দাঁড়িয়েছে। ঝন্টুর সাথে চোখাচোখি হতেই বর্ণমালা বলে ওঠে,

- কাকু স্কুল কবে খুলবে? কতদিন স্কুলের গাড়ি চড়ি নি।           

ঝন্টু কিছু বলার আগেই অদিতি মুখ ঝামটা দিয়ে ওঠে,

- তোমাকে বলেছি না এখন স্কুল খুলবে না। আর খুললেও আমি তোমাকে যেতে দেব না।

বর্ণমালা অসহায়ভাবে ঝন্টুর দিকে তাকিয়ে থাকে। যদি ঝন্টুকাকু মাকে বুঝিয়ে কিছু বলে। না, ঝন্টুকাকুও চুপচাপ।

- বল ঝন্টু। অদিতি বলে।

- বউদি বলতে খুব সংকোচ হচ্ছে। কোনদিন তো এরকম হয় নি। আসলে মাইনে পাচ্ছি নাতো। খুব হাত টানাটানি চলছে। মার তো হাই সুগার,প্রেসার। ওষুধ কেনার টাকা নেই । লজ্জায় কোথাও যেতে পারলাম না। তাই....

এবার দুর্গাপুজোতে ভাঁড় ভেঙে যা টাকা হবে সেই টাকা দিয়ে একটা সুন্দর জামা  কিনবে

বিপুল, অদিতি নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাহি করে। প্রায় দেড় মাস কাজ বন্ধ। গেল মাসে কর্মচারীদের বেতন দিয়ে বাড়িভাড়া আটকে গিয়েছে। জমানো টাকা প্রায় শেষ। সরকার তো অন্যান্য সব দোকান খুলতে অনুমতি দিচ্ছে। কিন্তু সেলুন, পার্লারে নো এন্ট্রি।

বিপুল অদিতিকে চুপচাপ দেখে ঝন্টু বলে,

- মাইনে পেলেই দিয়ে দেব।

- আসলে....., বিপুল কিছু বলতে যাচ্ছিল।

হঠাৎ বর্ণমালা ঘরের মধ্যে ছুট্টে গিয়ে দু'হাত দিয়ে ধরে একটা ভারী কিছু নিয়ে এলো।

- কাকু, কাকু এই লক্ষ্মীর ভাঁড়টা তুমি বাবুপড়ার রাসমেলায় আমায় কিনে দিয়েছিলে। আমি মা-বাবার সঙ্গে মেলায় গিয়েছিলাম। তুমিও কাকিমাকে নিয়ে গিয়েছিলে। মনে আছে , আমরা একসঙ্গে পাপড়ি চাট খেয়েছিলাম। এই নাও সেই লক্ষ্মীর ভাঁড়। তোমার মার ওষুধ কেনার টাকা হয়ে যাবে।

ইমেজ ক্রেডিট: T-Series
প্রতিদিন রাতে বাড়ি ফেরার পর বিপুল মেয়েকে আদর করে দু'টাকা, পাঁচ টাকার কয়েন দেয়। সেই কয়েনগুলোর বর্ণমালা লক্ষ্মীর ভাঁড়ে ছোট্ট ফাঁক দিয়ে গলিয়ে দেয়। বর্ণমালার  ইচ্ছে ছিল এবার দুর্গাপুজোতে ভাঁড় ভেঙে যা টাকা হবে সেই টাকা দিয়ে একটা সুন্দর জামা  কিনবে।

ঝন্টু তীব্রভাবে বাধা দিয়ে বলে,

- না না বর্ণমালা, তা হয় না।  বউদি আমি বরং দেখি অন্য কোথাও পাই কিনা।

ঝন্টু পা বাড়ায়। অদিতি ডান হাত বাড়িয়ে বলে,

- দাঁড়াও ঝন্টু। আজ মাতৃদিবস। তোমার মায়ের বিপদে আমার ছোট্ট মায়ের এই উপহার তুমি নাও। না করো না।

বিপুলও সঙ্গ দেয়,
-হ্যাঁ ঝন্টু নাও। 

বর্ণমালাও পিড়াপিড়ি করে,
- নাও না কাকু। ঠ্যাম্মার অসুখ এবার দেখো সেরে যাবে।

ঝন্টু স্থানুর মতো দাঁড়িয়ে। দু'চোখ আবছা হয়ে আসে।