Header Ads Widget

করোনাত্রাসিত ভারতে অসহায় প্রবীণরা

লেখক: দীপক সাহা, শিক্ষক

বিশ্বত্রাস করোনার কাছে দর্পিত মানুষের বিজ্ঞানবিন্যস্ত সভ্যতা আজ দিশাহারা, ছন্নছাড়া

বিষন্ন পৃথিবী ঘরের চার দেওয়ালে বদ্ধ।  চারিদিক থেকে একটা দমবন্ধকরা নিঃসঙ্গতা  টুঁটি টিপে ধরছে। এরই মধ্যে হঠাৎ একলা বৈশাখের সকালে সদর দরজায় কলিং বেলের শব্দ। দরজা খুলতেই দেখি মাখন পিসি। হাতে একটা ছোট কাঁঠাল।

Image
তৃতীয় পক্ষের চিত্র রেফারেন্স

 - বাবা, গাছের ফল। তুমি কাঁঠালের ঝাল খেতে ভালোবাসো। তাই বচ্ছরকার দিনে নিয়ে এলাম। পরেরবার বেঁচে থাকবো কিনা জানি না। করোনা ভূত এই বুড়িকে ছাড়বে না ।
- আরে না না। একদম ভয় পেও না, কিচ্ছু হবে না। ভেতরে এসো।
- না বাবা, সবাই বলছে দূরে দূরে থাকতে। যাই।

এই বলে কাঁঠালটা নীচে নামিয়ে রেখে দ্রুত পায়ে চোখের আড়াল হয়ে গেলেন। চলমান মাখনপিসি যেন করোনাতাঙ্কে দিশাহারা আমার হতভাগা দেশের ভীত সন্ত্রস্ত সহায়সম্বলহীন বার্ধক্যের প্রতিচ্ছায়া। বিমুঢ় হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। মাখন পিসি আমাদের পাড়ায় থাকেন।  বয়স আনুমানিক ৮৫। দরিদ্র বিধবা, ছেলেমেয়েরা মাকে করেছে দূরছাই। এখন একা। করোনার বিষাক্ত ছোবলে সবচেয়ে বেশি অসহায়, বিপন্ন মাখন পিসির মতো বয়স্করা।                                 

বিশ্বত্রাস করোনার কাছে দর্পিত মানুষের বিজ্ঞানবিন্যস্ত সভ্যতা আজ দিশাহারা, ছন্নছাড়া। ভয়ার্ত পৃথিবীতে বয়স্কদের  মারাত্মকভবে শারীরিক ও মানসিক অসুস্থতার ঝুঁকি ও মৃত্যু - এই দুটি বিষয় এখন আবিশ্বে অন্যতম আলোচনার কেন্দ্র। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, করোনায় বিধ্বস্ত ইতালিতে বৃদ্ধ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় সেখানে বয়স্কদের মৃত্যুহার বিশ্বে সর্বোচ্চ। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নানা ধরনের রোগব্যাধি শরীরে বাসা বাঁধতে শুরু করে। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। এ কারণে যেকোনও ধরনের সংক্রমণের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন বয়স্করা। সমীক্ষা মতে, বেশি বয়সী যাঁরা আগে থেকেই অন্য জটিল রোগে আক্রান্ত, তাঁরা এই মারণ ভাইরাসে বেশি ঝুঁকিতে আছেন। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন হৃদ্-যন্ত্রের রোগে ও ডায়াবেটিসের মতো গুরুতর রোগে আক্রান্তরা।  ফুসফুসের সমস্যা কিংবা অ্যাজমা রোগীদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা তৈরি করে করোনা ভাইরাস।

ইতিমধ্যেই বহুরূপী করোনাকে যুঝতে সরকার লক ডাউনসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশ্বজুড়ে করোনা ভাইরাসের মহামারির পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হু বয়স্কদের করোনাভাইরাসের সংক্রমণের ঝুঁকি কমানোর জন্য ঘরবন্দি থেকে বেশ কিছু স্বাস্থ্যবিধি নিয়ম মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছে।

ভারতের মতো জনবহুল দেশে নানান আর্থসামাজিক জটিল সীমাবদ্ধতার মধ্যে বয়স্কদের করোনার হাত থেকে রক্ষা করা সরকারের কাছে রীতিমতো একটা বিরাট চ্যালেঞ্জ। ভারতের ১৩ কোটি নাগরিক বা মোট জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ মানুষ ষাটোর্ধ্ব। তাঁদের মধ্যে চার কোটি মানুষ একা বাস করেন। তাঁদের বেশি অর্ধেক বৃদ্ধা। এবং নব্বই শতাংশ প্রবীণ নাগরিককেই বেঁচে থাকার জন্য কাজ করতে হয়। পরিবার ও সমাজে অপাংক্তেয় অনাহারক্লিষ্ট নানা রোগে জর্জরিত বৃদ্ধদের কাছে মাস্ক ও বারে বারে জল-সাবান দিয়ে হাত ধোয়া বিলাসিতা। এমতাবস্থায় পৃথিবীর বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের বয়স্কগণ বাস্তবিকই জীবন-মরণের সুক্ষ্ম সন্ধিক্ষণে।       

সময়ের দাবীতে ছোট পরিবারে বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জায়গা খুবই কম। তাঁরা এখন পরিবারের বোঝা, এক প্রকার উচ্ছিষ্ট অংশ। এরই ফলশ্রুতি হিসাবে বৃদ্ধাশ্রমের উদ্ভব। কর্মজীবন থেকে অব্যাহতি, স্বাস্থ্যের অবনতি - এই সকল অনুষঙ্গ নিয়ে যখন সবথেকে বেশি সহানুভুতি, শুশ্রূষা, সাহায্য, শারীরিক ও মানসিক আশ্রয়ের প্রয়োজন হয় তখনই সেই মানুষগুলো ঘরে-বাইরে অবহেলিত হয়ে যান। সার্বিকভাবে যেসকল বয়স্কদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নেই তাঁদের অবস্থা আরও সঙ্গীন। যাঁদের অর্থনৈতিক ক্ষমতা থাকে তাঁদেরও বৃহত্তর অংশ অর্থনৈতিক সফলতা থাকা সত্ত্বেও পারিবারিক গণ্ডির মধ্যে থাকার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।

আবার অনেক প্রবীণ বেশিরভাগ সময় নিজেরা নিজেদের খেয়াল রাখতে পারেন না। কেউ কেউ শিশুদের মতোও হয়ে যান। লক ডাউনের কারণে অতি বয়স্কদের দেখভাল করার জন্য গৃহ-সহায়িকারা এখন আসছেন না। ফলে সেই সব বয়স্কদের করুণ অবস্থা। অনেকের ঘরে খাবার বাড়ন্ত। পানীয় জলের অভাব। পায়ে হেঁটে রেশন নিয়ে আসার মতো শারীরিক ক্ষমতাও নেই। বাজারে জীবনদায়ী ওষুধের আকাল। চারিদিকে করোনাতাঙ্কের আবহে ত্রাহি ত্রাহি রবে নির্জন চার দেওয়ালে বদ্ধ বয়স্করা মানসিকভাবে ভীত, সন্ত্রস্ত, অসহায়। তাঁদের মনে হচ্ছে, আজকের রাতই শেষ রাত।     

এই দুঃসময়ে 'গুড সামারিটান'-এর মতো অন্যদের বয়স্কদের প্রতি বিশেষ যত্ন নিতে হবে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও মঙ্গলবার জাতির উদ্দেশ্যে এই বার্তা দিয়েছেন। যাতে আমাদের অসতর্কতা, অসাবধানতা বা কাণ্ডজ্ঞানহীনতার জন্য যেন এমন কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি না হয়, যার ফলে বাড়ির বয়স্কদের আমাদের হারাতে হয়। সেক্ষেত্রে ফল হবে আরও মারাত্মক। তখন করোনার বিষাক্ত নিঃস্বাসে আমরা সকলে ঝলসে যাব। শুনশান মৃত্যুপুরীতে শ্মশানে বা কবরে নিয়ে যাওয়ার মতো আর কেউ থাকবে না। অবশ্য এই কঠিন বিপর্যয়ে মরুভূমিতে মরুদ্যানের মতো বিভিন্ন সংস্থা বয়স্কদের সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে। তাঁদের প্রচেষ্টাকে কুর্নিশ জানাই। কিন্তু দেশের সামগ্রিক প্রয়োজনের তুলনায় তা অতি কিঞ্চিৎকর।     

এই দুঃসময়ে মানবিক সমাজ নির্মাণে মানবিক পরিবার বিনির্মাণের বিকল্প নেই। প্রতিটি পরিবারকে পরিবারস্থ বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের এই সময় অবশ্যই দায়িত্ব নিতে হবে এবং তবে তা বৃহত্তর মঙ্গল বয়ে নিয়ে আসবে। 

সমাজ ও পরিবারের প্রবীণদের কাঙ্খিত সঙ্গ দেওয়া জরুরি, যাতে  প্রবীণদের মাঝে একাকিত্ব, হতাশা ও বিরক্তি গ্রাস না করে। মানসিকভাবে তাঁরা যেন দুর্বল না হয়ে পড়েন। এই দুর্দিনে প্রতিটি পরিবার হতে হবে সফল, নিরাপদ ও ভরসাপূর্ণ ; থাকবে মানবাধিকারের ভিত্তি। এই চরম দুঃসময়ে    বয়স্কদের সামগ্রিকভাবে শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে সুস্থ থাকেন সেদিকে আমাদের সকলকে আন্তরিকভাবে খেয়াল রাখতে হবে।

 অন্যদিকে প্রশাসনের তরফে এলাকাভিত্তিক বয়স্কদের চিহ্নিত করে তাঁদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নিয়মিত খোঁজ খবর নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার সময় এসেছে।  প্রতি হতদরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রবীণকে মাস্ক, সাবান, প্রয়োজনীয় খাবার ও ওষুধপত্র দেওয়া অবশ্য কর্তব্য সরকারের। প্রয়োজনে বয়স্ক অসুস্থ ব্যক্তিকে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এব্যাপারে প্রশাসনের অন্যান্য দপ্তরের সঙ্গে স্থানীয় ক্লাবগুলোকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগানো যেতে পারে। সরকার এবং সকলের অঙ্গীকারবদ্ধ সৎ আন্তরিক প্রচেষ্টায় করোনার অশ্বমেধের ঘোড়ার অপ্রতিরোধ্য গতিকে অবশ্যই বশে আনা যাবে। মাখন পিসিরাও আবার আতঙ্কমুক্ত ভয়ডরহীন জীবন ফিরে পাবেন।